সঠিক উপায়ে হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি জানুন তাহলে আজকেই।

হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি

হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে অনেকেরই বেশ আগ্রহ রয়েছে। ভুট্টা আমাদের বাংলাদেশের খুবই জনপ্রিয় এবং অত্যন্ত পছন্দের একটি খাবার। ভুট্টা কি আমাদের দেশে বহুভাবে খাওয়া হয়ে থাকে? ভুট্টার খই তো অনেকের না হলে চলেই না সিনেমা দেখা বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা। ভুট্টার খই অনেকেই নিজেদের পছন্দের খাবারের তালিকায় রাখেন যাত্রাপথে বা ট্রাফিক জ্যামের বিরক্তিতে ভুট্টার খই না হলে চলে না। ট্র্যাফিক জ্যামের বিরক্তকর মুহূর্তে ভুট্টার ক্ষয় মনকে চাঙ্গা করার জন্য যথেষ্ট। তবে কি শুধু খই ভুট্টার রয়েছে আরও বহু গুনাগুন । আমাদের দেশে বহুকাল থেকেই ভুট্টা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন খাবার। মুখটা দিয়েই তৈরি করা যায় নানা রকম রুটি,ফিরনি, খিচুড়ি সহ স্বাদের এবং পুষ্টিকর অনেক খাবার। শুধু স্বাদেই নয় ভুট্টার রয়েছে বহু স্বাস্থ্য গুনাগুন। ভুট্টা তে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যা মানুষের হজম শক্তি বৃদ্ধিতে বেশ কার্যকারী। এটি পরিপাক তন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও খুবই উপকারী। ভুট্টা তে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাশিয়াম যা মানুষের উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের কারণের হৃদরোগ এবং স্ট্রোক হতে পারে। তাই ভোটটা খেলে হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভুট্টা একটি কার্যকরী খাবার হতে পারে কারণ ভুট্টায় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম থাকে। যার ফলে এটি শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না। যার ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ কার্যকারী একটি খাবার। ওজন কমাতে ভুট্টা অন্যতম এক কার্যকারী খাবার। তাই ওজন কমাতে চাইলে ভুট্টা কি আপনার খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন। কেননা  ভুট্টায় ক্যালারি কম এবং প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে। আর ফাইবার মানুষকে ভয় অনেক বেশি সময় ধরে পূর্ণ রাখতে সাহায্য করে। যা অতিরিক্ত খাবার রোধ করতে সাহায্য করে। এগুলো ছাড়াও ভুট্টার রয়েছে আরও বহু গুণাগুণ। এবার জেনে নেওয়া যাক হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে ।

হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি

আমাদের দেশি ভুট্টার চেয়ে হাইব্রিড ভুট্টা চাষের আলাদা কিছু সুবিধা যার ফলে অনেকেই এখন চান হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে। হাইব্রিড ভুট্টা চাষের অন্যতম একটি ভালো দিক হচ্ছে এটি আমাদের দেশি ভুট্টার চেয়ে ফলন অধিক পরিমাণে বেশি দেয়। গবেষণায় দেখা যায় আমাদের দেশীয় স্থানীয় ভুট্টার চেয়ে হাইব্রিড ভুট্টা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া যায়। হাইব্রিড ভুট্টার রয়েছে বহু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। যেমন বাদামি পাতা পাতা পোড়া রোগ এবং ভুট্টার ডাঁটা গলন। যার ফলে এটি কৃষকের রাসায়নিক ওষুধের নির্ভরতা অনেক কমিয়ে দেয় এসবের প্রয়োজন হয় না। এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। দেশী ভুট্টার তুলনায় হাইব্রিড ভুট্টা পরিবেশের সাথে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। এবং সব রকম মাটিতেই খুব ভালোভাবে হয়ে যায়। এটি খরা বন্যা সহ বিভিন্ন জলবায়ুতে চাষ করা যেতে পারে।

হাইব্রিড ভুট্টার জাত

ভুট্টা চাষের জন্য সঠিক জাত নির্বাচন করা বেশ জরুরী। আপনার এলাকার আবহাওয়া এবং আপনার মাটির উপর পরীক্ষা এবং বিবেচনা করে আপনাকে ভোটটা জাত নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশে হাইব্রিড ভুট্টার বেশ কিছু জাত রয়েছে। নিচে হাইব্রিড ভুট্টার কিছু জাত দেওয়া হলো।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ১:এই জাতটি রবি মৌসুমে ১২৫-১৩০ দিনের মধ্যেই ফসল পেকে যায়। এটির হলুদ রঙের দানা হয়ে থাকে এবং মোচার আকার মাঝারি। এটি উচ্চ ফলনশীল এবং খরা সহিষ্ণু।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ২:এই জাতটি রবি মৌসুমে ১২০-১২৫ দিনের মধ্যেই পেকে যায়। এটির দানাও হলুদ রঙের এবং মোচার আকার মাঝারি হয়ে থাকে। এটি একটি উচ্চ ফলনশীল এবং পোকামাকড় প্রতিরোধে জাত।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ৩:এই জাতটি রবি মৌসুমে ১৩০  থেকে ১৩৫ দিনে পেকে যায়। পেটের দানা ও সাধারণত হলুদ রঙের এবং মোচার আকার মাঝারি হয়ে থাকে। এটি রোগ প্রতিরোধী এবং খাওয়ার জন্য ভালো।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ৪:এই জাতটিও রবি মৌসুমে ১২৫ থেকে ১৩০ দিনে পাকে। এটির দানাও হলুদ রঙের এবং মোচার আকৃতি মাঝারি হয়ে থাকে। এটি খুবই উচ্চ ফলনশীল এবং লবণাক্ত মাটি সহিষ্ণু।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ৫:এই জাতটি খরিপ মৌসুমে ১১০-১১৫ দিনে মধ্যে পেকে যায়। এটির দানাও হলুদ রঙের এবং মোচার আকার মাঝারি হয়ে থাকে। এটি একটি উচ্চ ফলনশীল এবং গুণগত মানসম্পন্ন প্রোটিন সমৃদ্ধ জাত।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ৬: ভুট্টার এই জাতটিও রবি মৌসুমে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনে পাকে। এটির দানাও অন্যান্য ভুট্টার মত হলুদ রঙের এবং মোচার আকার মাঝারি হয়ে থাকে। এটি উচ্চ ফলনশীল এবং খরা সহিষ্ণু একটি জাত।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ৭:এই জাতটি খরিপ মৌসুমে ১০৫-১১০ দিনে পেকে যায়। এটির দানাও হলুদ রঙের এবং মোচার আকার মাঝারি হয়ে থাকে। এটি উচ্চ ফলনশীল এবং পোকামাকড় প্রতিরোধী একটি জাত।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা ৮:এই জাতটি রবি মৌসুমে ১৩৫ থেকে ১৪০ দিনে পেকে থাকে। এটির দানা হলুদ রঙের এবং মোচার আকার মাঝারি হয়ে থাকে। এটি উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী একটি হাইব্রিড ভুট্টার জাত।

এগুলো ছাড়াও ভুট্টার আরো বেশ কিছু জাত রয়েছে। তাই ভুট্টা চাষ করার পূর্বে আপনার মাটি এবং আবহাওয়া পরীক্ষা এবং বিবেচনা করে স্থানীয় কৃষিবিদের পরামর্শ নিয়ে ভুট্টার জাত নির্বাচন করুন।

বীজ বপণের হার এবং দূরত্ব

হাইব্রিড ভুট্টার বীজ বপনের দূরত্ব এবং বীজ বপণের হার। নির্ভর করে আপনার বীজের জাতের উপর। এবং মাটির উপর। তাই বীজ কেনার সময় আপনাকে সুপারিশ কৃত দূরত্ব অনুযায়ী বীজ বপন করুন। তবুও আপনাদের সুবিধার্থে একটি সাধারণ নির্দেশিকা হলো।

প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ১২ কেজি বীজ রোপন করা যেতে পারে। এবং বীজ বপন করার সময় মাটির গভীরতা ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার রাখা উচিত। এবং এক বীজ থেকে আরেক বীজ এর দূরত্ব রাখতে হবে ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার। এবং এক সারি থেকে আরেক সারির দূরত্ব রাখতে হবে ৬০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার।

বীজ বপন শেষে মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি দিন। এবং পোকামাকড় ও রোগ থেকে রক্ষা করুন।

সঠিক সার ব্যবস্থাপনা

হাইব্রিড ভুট্টা খুবই উচ্চ ফলনশীল একটি ফসল। এর সঠিক ফলন পেতে। সঠিক নিয়মে এবং সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করা উচিত। তবে এর থেকে আশা স্বরূপ ভালো ফলন পাওয়া যাবে।

আর সার প্রয়োগের আগে ও মাটি পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত এতে করে আপনার ফসলের মাটির পুষ্টি ঘাটতি সম্পর্কে জানা যাবে। এবং প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার করতে সুবিধা হবে।

সার ব্যবহারের একটি সাধারণ নির্দেশিকা হলো।

প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া সার ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি।

প্রতি হেক্টর এর টিএসপি সার ১৫০ থেকে ২০০ কেজি।

প্রতি হেক্টরে এমওপি ১০০ থেকে ১৫০ কেজি।

প্রতি হেক্টরের জিপসাম ১০০ কেজি।

প্রতি হেক্টরের জিংক সালফেট ১০ কেজি।

প্রতি হেক্টরে বোরিক এসিড ২ কেজি।

সার ব্যবহারের নিয়ম। 

ইউরিয়া: সারের মোট পরিমাণের তিন ভাগের এক ভাগ বীজ বপনের পূর্বে, তিন ভাগের এক ভাগ বীজ বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর এবং তিন ভাগের এক ভাগ বীজ বপনের ৬০-৬৫ দিন পর প্রয়োগ করা উচিত।

টিএসপি,এমওপি,জিপসাম,জিংক সালফেট,বোরিক এসিড।

এগুলো প্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের পূর্বে। স্যারের সম্পূর্ণ পরিমাণ প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ দেওয়ার নিয়ম

অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় রবি মৌসুমের শেষ প্রয়োগ করলে তুলনামূলক ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। প্রথম সেচ করতে হবে বীজ বপনের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে, এবং দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে বীজ বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে, ৬০ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যে তৃতীয় এবং ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে চতুর্থ সেচ দেওয়ার যেতে পারে। দানা বাধা এবং ফুল ফোটার সময় জমিতে পানি জমে থাকলে এটি জমির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত চারা তুলে ফেলতে হবে চারা গজানোর ৩০ দিনের মধ্যেই। জমিতে আগাছা দেখা দিলে তা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে দ্রুত।

রোগবালাই ব্যবস্থাপনা

হাইব্রিড ভুট্টা খুবই উচ্চ ফলনশীল একটি জাত। তবে বিভিন্ন রোগ বালাই এটির ফলন অনেক কমিয়ে দিতে পারে। তাই কোনো রোগ বালাই দেখা দিলে জরুরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

হাইব্রিড ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে পরিচিত কিছু রোগ হলো। পাতায় বাদামি দাগ, পাতা পচে যাওয়া, ছত্রাক জনিত রোগ, গাছের গোড়ায় পচন, গাছ ভেঙ্গে পড়া। পাশাপাশি জমিতে বেশ কিছু পোকামাকড় দেখা যেতে পারে এদের মধ্যে অন্যতম হলো মাটি উইপোকা, তৃণভোজী পোকা, এবং বোরার। এই পোকা গুলো চারা গাছ কেটে ফেলে। পাতা ক্ষয় করে এবং গাছের গভীরে প্রবেশ করে গাছের ক্ষতি করে। খেয়াল রাখতে হবে জমির আগাছার দিকেও জমিতে আগাছা জন্মালে তা দ্রুত দমন করতে হবে।

উপরের রোগ বালাই থেকে গাছকে রক্ষা করতে হলে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সঠিক নিয়মে সার প্রয়োগ করতে হবে। এবং মৃত বা খারাপ গাছকে কেটে ফেলা বা দমন করতে হবে। এবং উপরে উল্লেখিত কোন সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রিয় পাঠক আমাদের আজকের আর্টিকেলে আপনাদেরকে হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আশা করি আমাদের আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে হাইব্রিড ভুট্টা চাষ পদ্ধতির সম্পর্কে আপনি একটি ভালো ধারণা পেয়েছেন।

আরও পড়ুন ধনিয়া চাষ পদ্ধতি এর জন্য বীজ বপন, সার প্রয়োগ ও সেচ পদ্ধতি।

Similar Posts