লেটুস পাতা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক নিয়ম জেনে নিন আজই।

লেটুস পাতা চাষ পদ্ধতি

লেটুস পাতা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে অনেকেরই আগ্রহ রয়েছে। যার ফলে লেটুস পাতা চাষ পদ্ধতি লিখে অনেকেই প্রতিনিয়ত গুগলে সার্চ করে থাকেন। লেটুস পাতা খুবই পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর একটি শাক। আমরা শাক রান্না করতে গিয়ে অনেক সময় শাকের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে ফেলি কিন্তু লেটুস পাতা এমন এক শাক যা রান্না করা ছাড়াই খাওয়া যায়। যার ফলে পুষ্টিগুণ হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। লেটুস পাতা কে রান্না করা ছাড়াই সালাদ হিসেবে শসা টমেটো মরিচ এর সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়। পাশাপাশি বার্গার এবং স্যান্ডউইচে লেটুস পাতা ব্যবহার হয়। কোনরকম সিদ্ধ করা বা রান্না করার প্রয়োজন পড়ে না তাই লেটুস পাতার পুষ্টিগুণ থাকে অটুট।

লেটুস পাতা শুধু সুস্বাদুই নয় লেটুস পাতা খুবই পুষ্টিকর একটি শাক। এটিতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, কে, ই, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। ভিটামিনের পাশাপাশি লেটুস পাতাতে রয়েছে খনিজ পদার্থ যেমন পটাশিয়াম,  ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং ফাইবার। লেটুস পাতাতে থাকা ফাইবার আমাদের ওজন কমাতে খুবই সাহায্য করে। ফাইবার এর ফলে আমাদের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে যার ফলে ওজন কমে। লেটুস পাতায় থাকা পটাশিয়াম আমাদের রক্ত চলাচল ঠিক রাখে যার ফলে হৃদরোগ এর ঝুঁকি কমে যায়। লেটুস পাতায় থাকা ভিটামিন আমাদের হার শক্ত করতে সাহায্য করে। এগুলো ছাড়াও লেটুস পাতার রয়েছে আরও বহু স্বাস্থ্য উপকারিতা যার ফলে লেটুস পাতা অনেক দেশেই খুবই জনপ্রিয়।

লেটুস পাতা চাষ পদ্ধতি

লেটুস পাতা খুবই জনপ্রিয় এবং অনেক চাহিদা থাকায় অনেকেই লেটুস পাতা কিভাবে চাষ করতে হয় তা জানতে চান। তাই আমাদের আজকের এই এক আর্টিকেলে আপনি লেটুস পাতা চাষের সবকিছু জানতে পারবেন। তাই চলুন জেনে নেওয়া যাক।

চাষের মৌসুম:

আমাদের দেশে লেটুস পাতা চাষের জন্য সবথেকে উত্তম মৌসুম হচ্ছে রবি মৌসুম অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত। আমাদের দেশের আবহাওয়া অনুযায়ী এই সময়টাতে লেটুস পাতা সব থেকে ভালো জন্মায়। যদিও শীত প্রদান দেশগুলোতে সারা বছর লেটুস পাতা চাষ করা যায়। তবে আমাদের দেশ শীত প্রধান না হওয়ায় রবি মৌসুম চাষের জন্য সবথেকে উপযোগী সময়।

লেটুস পাতার জাত:

বাংলাদেশের বেশ কিছু লেটুস পাতার জাত রয়েছে। তার ভিতরে অন্যতম জনপ্রিয় কিছু জাত হলো। বারি লেটুস-১, বিগ বোস্টন, হোয়াইট বোস্টন, প্যারিস হোয়াইট, গ্র্যান্ড ব্যাপিড, নিউইয়র্ক-৫১৫, ইম্পিরিয়াল-৫৪, সিম্পসন, কিং ক্রাউন, কুইন ক্রাউন, ডার্ক, গ্রিন, গ্রেটলেক। বাংলাদেশে এই জাত গুলো সব থেকে বেশি জনপ্রিয়। তবে সব জায়গায়ই সবগুলো জাত একেবারে না পাওয়া যেতে পারে তাই উপরে উল্লেখিত জাত গুলোর মধ্যে থেকে যে কোন একটি জাত নির্বাচন করে স্থানীয় বাজারে খোঁজ নিন।

উপরে উল্লেখিত জাত গুলোর মধ্যে বারি লেটুস-১ কে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়ে থাকে এবং এটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় যা খুবই দ্রুত বড় হয় এবং রোগ প্রতিরোধী। পাতাগুলো বড়, সবুজ এবং মসৃণ। তাই আপনি এই জাতটিকে নির্বাচন করতে পারেন।

জমি তৈরি

লেটুস পাতা দোআঁশ মাটিতে সব থেকে ভালো জন্মায়। তাই দোআঁশ মাটি দেখে জমি নির্বাচন করার চেষ্টা করুন। লেটুস পাতা চাষের জন্য জমির মাটি হতে হবে উর্বর এবং ঝুরঝুরে। তাই চাষের আগে মই ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করুন। আর মাটি যদি বেশি ঝুরঝুরে হয় তাহলে জৈব সার ব্যবহার করুন।

বীজ বপন এবং চারা রোপন

লেটুস পাতা চাষের জন্য সরাসরি জমিতে বীজ বপন করতে পারেন অথবা বীজতলা তৈরি করেও বীজ বপন করতে পারেন। বীজতলা তৈরি করে বীজ বপনের ক্ষেত্রে বীজতলার মাটি উর্বর হতে হবে। সাধারণত প্রতি শতাংশে আনুমানিক ৪ গ্রাম লেটুস পাতার বীজ প্রয়োজন হয় তবে আপনি যদি বীজ তলায় বীজ বপন করেন তাহলে ২০ গ্রাম প্রয়োজন হবে। লেটুস পাতার বীজ খুবই ছোট হয়ে থাকে তাই বীজ বপণের সময় বীজের সাথে ছাই কিংবা মাটির কণা ব্যবহার করুন।

চারা রোপন করতে হবে যখন চারার বয়স হবে এক মাস। সাধারণত এক মাস বয়সী চারা জমিতে রোপন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। চারা রোপন করতে হবে লাইন অনুসারে এক লাইন থেকে অন্য লাইনের দূরত্ব রাখতে হবে ১২ ইঞ্চি এবং এক চারা থেকে আরেক চারা দূরত্ব রাখতে হবে ৮ ইঞ্চি। ঠিক এই নিয়ম অবলম্বন করে চারা রোপন করতে হবে। আর চারা রোপনের সব থেকে ভালো সময় হচ্ছে বিকেল বেলা।

সার প্রয়োগ:

লেটুস পাতা চাষের ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে সার প্রয়োগ করতে হবে তবেই ভালো ফলন পাওয়া যাবে। লেটুস পাতা চাষের জন্য শতাংশ প্রতি স্যারের পরিমাণ হচ্ছে গোবর ২০ কেজি, খৈল ৮০০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম, পটাশ ১০০ গ্রাম এবং সবশেষ ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম।

গোবর সারকে প্রয়োগ করতে হবে জমি তৈরীর সময় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে। টিএসপি এবং পটাশকে জমি তৈরীর সময় চারা রোপণের আগে জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এবং সবশেষে ইউরিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই কিস্তিতে জমিতে রোপণ করতে হবে প্রথম ভাগ চারার বয়স যখন ১০ দিন তখন এবং দ্বিতীয় ভাগ প্রয়োগ করতে হবে চারার বয়স যখন ২০ দিন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে সার প্রয়োগ করতে হবে এবং সার প্রয়োগ শেষে পর্যাপ্ত সেচ দিতে হবে।

বালাই ব্যবস্থাপনা

লেটুস পাতা চাষে খুবই পরিচিত একটি রোগ হচ্ছে “ছাতা” রোগ এই রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে পাতা নুয়ে পড়া বা পাতার কিছুটা অংশ পুড়ে যাওয়া। এমন রোগ দেখা দিলে অবশ্যই আক্রান্ত গাছটিকে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। এবং এই রোগ থেকে রক্ষা পেতে হবে বীজ এবং মাটি শোধন এর মাধ্যমে। লেটুস পাতা চাষে পোকার মধ্যে সবথেকে বেশি দেখা যায় জাবপোকা। এই পোকা খুবই ক্ষতিকর এরা পাতার রস চুষে খেয়ে ফেলে। এবং এই পোকা থেকে এক প্রকার তরল পদার্থ বের হয় যা পাতায় আটকে থাকে এবং পাতার মধ্যে এক ধরনের ছত্রাক এর জন্ম হয়। যা চারার জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই এই পোকা থেকে গাছকে রক্ষা করতে হবে। এই পোকার পরিমাণ যদি কম দেখা যায় তাহলে হাত দিয়ে মেরে ফেলা সব থেকে বেশি উত্তম। আর যদি পরিমাণে বেশি হয়ে থাকে তাহলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। তবে কীটনাশক ব্যবহার করার ১৫ দিনের মধ্যে এই শাক খাওয়া মোটেও উচিত হবে না।

ফসলের পরিচর্যা

ভালো ফলন পাওয়ার জন্য জমি সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। আগাছা জন্মালেই দ্রুত তা দমন করতে হবে। মাটি যদি শুকিয়ে যায় তাহলে প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হবে। এবং একই সাথে জমিতে যদি বেশি পানি জমে থাকে তাহলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চারা যদি বেশি ঘন দেখা দেয় তাহলে এটিকে কমিয়ে পাতলা করে দিতে হবে। 

ফসল সংগ্রহ:

চারা রোপনের আনুমানিক একমাস পর লেটুস পাতা খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায়। তাই চারা রোপনের একমাস হয়ে গেলে গাছসহ লেটুস পাতা কে তুলে ফেলুন। তবে যদি বসতবাড়ির কম গাছ হয় সেক্ষেত্রে পাতা ছিড়ে ব্যবহার করতে পারেন। লেটুস পাতা শতাংশ প্রতি অনুমানিক ৪০ কেজি ফলন হয়ে থাকে।

প্রিয় পাঠক আশা করি আমাদের আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনি লেটুস পাতা চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন আরও এমন সব আর্টিকেল পড়তে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন।

আরও পড়ুন – সঠিক উপায়ে হাইব্রিড ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি জেনে-নিন আজকেই

Similar Posts