পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক নিয়ম গুলো জানুন।

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকে জানতে চান। পেঁপে চাষ খুবই লাভজনক এবং খুবই কম খরচে করা যায়। যার ফলে আমাদের দেশে বর্তমানে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষ করছেন আবার অনেকে করার চিন্তা ভাবনা করছেন। পেঁপে খুবই সুস্বাদু একটি ফল। যা ছোট বড় সকলেই পছন্দ করে থাকেন। আমাদের দেশে যে ফলগুলোর সব থেকে ভালো চাষ হয় তার ভেতরে পেঁপে অন্যতম। পেঁপেতে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সহ আরো বহু পুষ্টিগুণ। যার রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা।

  • পেঁপেতে থাকা পেপেইন এবং প্যাপাইন নামক এনজাইম প্রোটিন হজমে শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্বল, গ্যাস এবং পেট ফোলাভাবের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।  একই সাথে এটি সর্দি, কাশি এবং জ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এটি গর্ভাশয়ের ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার এবং প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ থাকে যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এটি রাতের অন্ধত্ব, এবং ছানি রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে ক্যালোরি কম এবং ফাইবার বেশি থাকে। যার ফলে পেঁপে খেলে দীর্ঘক্ষণ আপনার পেট ভরা থাকবে যা আপনার ওজন কমাতে সাহায্য করবে।

পেঁপে সুস্বাদু এবং এত সব স্বাস্থ্য উপকারিতা থাকায় পেঁপে চাষ করতে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ আগ্রহী হচ্ছেন। তবে পেঁপে চাষে ভালো ফলাফল পেতে হলে আমাদের সঠিক নিয়মে পেঁপে চাষ করতে হবে। তাই আমাদের সকলেরই পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরী।

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি

পেঁপে চাষের ক্ষেত্রে অনেকেই আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন না যার ফলে ভালো ফলন পান না। ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে।

পেঁপের জাত

বাংলাদেশে অনেকগুলো পেঁপের জাত রয়েছে। সেখান থেকে আপনাকে অবশ্যই উন্নত মানের এবং বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ ক্রয় করতে হবে। বাংলাদেশের পেঁপের কিছু জাত হলো:

ওয়াশিংটন, কোয়েম্বাটুর-১ ও কোয়েম্বাটুর-২, কুর্গ হানিডিউ, সোলো সানরাইজ।

হাইব্রিড জাত : পুসাডোয়ার্ফ, পুসা নানহা, পুসা ম্যাজ্যেষ্টিক, পুসা রাসেল ইত্যাদি।

এখান থেকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী পেঁপের জাত নির্বাচন করুন।

জমি নির্বাচন এবং জমি তৈরি

বাংলাদেশের প্রায় সব রকম মাটিতেই পেঁপে চাষ করা যায়। তবে সবথেকে ভালো হয় যদি দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি নির্বাচন করেন। এই দুই মাটিতে সাধারণত পেঁপে সবথেকে ভালো হয়ে থাকে। তবে জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে উচ্চ জমি নির্বাচন করতে হবে কারণ পেঁপে গাছ একদমই জলাবদ্ধতা বেড়ে উঠতে পারে না। তাই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং সেচ সুবিধা রয়েছে এমন একটি উঁচু জমি নির্বাচন করুন।

পেঁপে চাষের জন্য জমিতে বারবার মই দিয়ে জমির মাটি উর্বর করে নিন। একইসাথে পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ৩০সে.মি চওড়া এবং ২০ সে.মি. গভীর নালা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি বেড হতে হবে ২ মিটার চওড়া এবং জমি অনুযায়ী লম্বা হতে হবে।

গর্ত তৈরি এবং সার প্রয়োগ

চারা রোপনের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে বেডের মাঝ বরাবর ২ মিটার দূরত্বে চারদিকে  ২ ফুট পরিমাণ গর্ত করে নিতে হবে। এবং প্রতি গর্তে নিয়ম অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে সার দেওয়ার আগে সারের সঠিক পরিমাণ জানতে আপনার জমির মাটি পরীক্ষা করে নিতে পারেন এতে করে জমির মাটির পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ধারণা পাবেন। প্রতি গর্তে সার প্রয়োগের একটা সাধারণ নির্দেশিকা হল:

১৫ কেজি পচা গোবর, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার, ৫০০ গ্রাম টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি সার, ২৫০ গ্রাম জিপসাম, ২০ গ্রাম বরিক এসিড এবং ২০ গ্রাম জিংক সালফেট প্রতিটি গর্তে প্রয়োগ করতে হবে।

এই সারগুলো গর্ত তৈরীর সময় প্রয়োগ করতে হবে। তবে ইউরিয়া ও এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর পর যখন নতুন পাতা গজাবে তখন প্রতি একমাস পর পর ৫০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এবং গাছে ফুল আসলে প্রতি একমাস পরপর ১০০ গ্রাম করে প্রয়োগ করতে হবে।

চারা তৈরি ও চারা রোপন

আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁপে চাষে ভালো ফলন পেতে হলে বীজ বপন করুন আশ্বিন থেকে পৌষ মাসের মধ্যে। এই সময়টা পেঁপের বীজ বপনের সবথেকে ভালো সময়।

প্রতি হেক্টরে অনুমানিক ১৫০ গ্রাম থেকে ৩০০ গ্রাম পেঁপের বীজের প্রয়োজন হয়। তবে যদি হাইব্রিড বীজ হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম বীজই যথেষ্ট। পেঁপের চারা পলিথিন ব্যাগেও তৈরি করা যায় আবার বীজতলা তৈরি করেও করা যায়।

যদি বীজতলা তৈরি করে চারা রোপন করেন সে ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারি তৈরি করুন এবং তিন থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার গভীরে বীজ বপন করুন।

সাধারণত পেঁপের বীজ বপনের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই বীজ থেকে চারা বের হয়ে যায়। এবং তা ৪০ থেকে ৫০ দিন পর রোপনের উপযোগী হয়ে যায়।

পলিব্যাগে চারা রোপন করলে লক্ষ্য রাখুন চারা রোপনের সময় যেন মাটি ভেঙ্গে না যায়। এবং পলিব্যাগে গাছ যতটা গভীরে ছিল ঠিক ততটা গভীরে যেন থাকে। আর চারা রোপনের সব থেকে ভালো সময় হচ্ছে বিকেল বেলা।

গাছের পরিচর্যা

পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে অবশ্যই আপনাকে গাছের পরিচর্যা করতে হবে। তবেই ভালো ফলন পাওয়া যাবে।

  • নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। বিশেষ করে গাছ যখন বড় হওয়া শুরু করবে। মাটি শুকিয়ে গেলেই সেচ দিতে হবে। তবে অবশ্যই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে অতিরিক্ত পানি জমে থাকা যাবেনা।
  • সার প্রয়োগের জন্য মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিন এবং সারের পরিমাণ নির্ধারণ করুন।
  • নিয়মিত মাটি আলসা করে মাটির স্তর নরম রাখুন এবং আগাছা দমন করুন।
  • পেঁপে গাছে অতিরিক্ত শাখা জন্মালে অতিরিক্ত শাখা কেটে ফেলুন যাতে গাছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে এবং ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
  • গাছে ফল ধরার পর যদি গাছ ভার বহন না করতে পারে গাছকে বাঁশ বা কোন কিছু দিয়ে বেঁধে দিন।
  • পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করুন।

পেঁপে গাছের কিছু পরিচিত রোগ হলো: মোজাইক রোগ, ঢলে পড়া ও কাণ্ড পঁচা রোগ, পেঁপের ড্যাম্পিং অফ রোগ। এই রোগ গুলো হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত দমন করতে হবে।

প্রিয় পাঠক আশা করি আমাদের আজকের এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আপনি পেঁপে চাষের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। আরো এমন সব আর্টিকেল পড়তে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন।

আরও পড়ুন – মাশরুম চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক নিয়মগুলো জেনে নিন আজই

Similar Posts